Breaking News
Home / অন্যান্য / সাগরে ডুবন্ত মানুষকে রক্ষা করে কারাগারে যান যে ক্যাপ্টেন

সাগরে ডুবন্ত মানুষকে রক্ষা করে কারাগারে যান যে ক্যাপ্টেন

নাবিকদের জন্য বহু পুরনো একটি আইন রয়েছে, যাতে বলা আছে– সাগরে কোনো জাহাজ যদি আরেকটি জাহাজকে ডুবতে দেখে, তা হলে অবশ্যই ডুবন্ত জাহাজের লোকজনকে উদ্ধার করতে হবে।

কিন্তু স্টেফান স্মিত নামে মানবতাবাদী জাহাজের এক ক্যাপ্টেন সাগরে ডুবন্ত একদল মানুষের জীবন বাঁচিয়ে কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে জেল পর্যন্ত খেটেছেন।

২০০৪ সালের জুন মাস। ক্যাপ আনামুর নামে জার্মানির ত্রাণ সংস্থার একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মিসরের সুয়েজখালের দিকে যাচ্ছিল।

জাহাজটির গন্তব্য ছিল ইরাক। একদিন দুপুরে হঠাৎ জাহাজের নাবিকরা সাগরে অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখে ক্যাপ্টেন স্টেফান স্মিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। খবর বিবিসির।

ক্যাপ্টেন স্টেফান স্মিত ঘটনার ১৪ বছর পর গণমাধ্যমের কাছে সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি বলেন, আমরা দেখলাম একটি রাবারের তৈরি নৌকায় বেশ কিছু মানুষ। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ওরা হয়তো সাগরে কোনো তেলক্ষেত্রের প্লাটফর্মের কর্মী।

পরে কাছে গিয়ে দেখলাম ডুবন্ত একটি রাবারের নৌকায় ৩৭ জন বিপন্ন আফ্রিকান। জাহাজটি কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ ছিল না। জার্মান একটি ত্রাণ সংস্থার এই জাহাজটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিল।

রাবারের নৌকা থেকে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। নৌকার লোকজন আমাদের বলল, বড়জোর ঘণ্টাখানেক ভেসে থাকতে পারে তাদের নৌকা।

তারা জানাল, তিন দিন ধরে তারা সাগরে ভাসছে। নৌকায় খাওয়ার কোনো পানি ছিল না। ওই অবস্থায় পানি ছাড়া বড়জোর তিন দিন বেঁচে থাকা সম্ভব।

জাহাজের সবাই একমত, লোকগুলোকে বাঁচাতে হবে। কারণ বহু পুরনো একটি আইন রয়েছে, যাতে বলা আছে– সাগরে কোনো জাহাজ যদি আরেকটি জাহাজকে ডুবতে দেখে, তা হলে অবশ্যই ডুবন্ত জাহাজের লোকজনকে উদ্ধার করতে হবে।

তাদের নিরাপদে নিয়ে যেতে হবে। তারা কারা, কোথা থেকে আসছিল, সেগুলো কোনো বিবেচনা করা যাবে না।

উদ্ধারকারী জাহাজ না হলেও ক্যাপ্টেন স্মিত সেদিন ওই ৩৭ আফ্রিকান অভিবাসীকে নৌকা থেকে তার জাহাজে তুললেন।

তিনি চাইছিলেন, একটি নিরাপদ বন্দরে তাদের নামিয়ে দিয়ে তিনি আবার ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন।

সবচেয়ে কাছে ছিল সিসিলি। সেদিকেই জাহাজ ঘোরালেন তিনি। আর তাতে শুরু হলো বিপত্তি।

ইতালির সাগর সীমায় ঢোকার ঠিক আগ মুহুর্তে ইতালির কোস্টগার্ডের কাছ থেকে বার্তা এলো জাহাজ যেন আর না এগোয়।

স্মিত বলেন, একটি জার্মানির জাহাজ, ইউরোপীয় জাহাজকে এমন নির্দেশ দেয়ায় আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। তবে আমি নির্দেশ মানলাম।

জাহাজ থামিয়ে আমি ইতালির কর্তৃপক্ষ এবং জার্মান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলাম, তাদের সাহায্য চাইলাম। কিন্তু কোথা থেকেও ইতিবাচক কোনো সাড়া পেলাম না।

তখনও অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের রাজনীতিতে তোলপাড় চলছিল। ইতালি তখন অভিবাসন আইন শক্ত করতে শুরু করেছিল এবং তারা কোনো কথা শুনতেই রাজি হচ্ছিল না।

তাদের ভয় ছিল এই ৩৭ আফ্রিকানকে সিসিলিতে নামতে দিলেই তারা রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবে। কিন্তু একই সঙ্গে অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশও দায়িত্ব নিতে চাইছিল না।

আমরা মল্টাকে অনুরোধ করেছিলাম, জার্মানিকে অনুরোধ করেছিলাম এই লোকগুলোকে তারা যেন আশ্রয় দেয়। কেউই রাজী হলো না। যেহেতু লোকগুলোকে যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকে ইতালি সবচেয়ে কাছে। সুতরাং আমি ইতালির ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছিলাম।

২০০৪ সালে এই খবর যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল যে, একটি ইউরোপীয় জাহাজকে ইউরোপীয় একটি বন্দরে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে না, সেটি বিশ্বজুড়ে বড় খবর হয়ে গেল।

ক্যাপ আনামুর ত্রাণ সংস্থার চেয়ারম্যান এলিয়েস পিয়েডাল তখন ওই ত্রাণ জাহাজেই ছিলেন। তিনি বলেছিলেন– এই লোকগুলো তো মানুষ। ডুবন্ত জাহাজ থেকে আমরা তাদের উদ্ধার করেছি।

সবচেয়ে বড় কথা– একটি ইউরোপীয় জাহাজের অধিকার রয়েছে ইউরোপীয় যে কোনো বন্দরে ভেড়ার।

অভিবাসন নীতি নিয়ে ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে হবে। ইউরোপকে দুর্গ বানানোর নীতির কারণে হাজার হাজার মানুষের সাগরে ডুবে মৃত্যু হবে- এটি হতে পারে না।

সিসিলির বন্দরের কাছে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে জাহাজের সবাই অস্থির হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে পড়লেন ওই ৩৭ আফ্রিকান।

দশম দিনে আফ্রিকান অভিবাসীদের দুজন এতটাই অস্থির হয়ে পড়লেন যে, তারা জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেয়ার চেষ্টা করলেন। তবে তাদের সেদিন আটকানো গিয়েছিল।

উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্মিত। তিনি ইতালির কর্তৃপক্ষকে বললেন, এভাবে আর সম্ভব হচ্ছে না।

আপনারা অনুমতি না দিলেও আন্তর্জাতিক আইনের বলে আমি বন্দরে জাহাজ ভেড়াবো।

পরের দিন সকালে অনুমতি মিলল। কিন্তু জাহাজের যাত্রীদের সংকট দূর হলো না। পরিষ্কার হয়ে উঠল যে, ইতালির সরকার সাগরে অভিবাসী উদ্ধারের ইস্যুতে একটি শক্ত বার্তা দিতে বদ্ধপরিকর ছিল।

৩৭ আফ্রিকান অভিবাসী, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ঘানা ও নাইজেরিয়ার নাগরিক। তাদের একটি আটক কেন্দ্রে নেয়া হলো এবং নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ক্যাপ আনামুর জাহাজটিকে আটক করা হলো।

পাশাপাশি ক্যাপ্টেন স্মিট, ফার্স্ট অফিসার এবং এলিয়েস পিয়েডালকে গ্রেফতার করা হলো। তাদের কারাগারে পাঠানো হলো।

ইতালির কর্তৃপক্ষ চাইছিল তাদের যেন ১২ বছর করে জেল হয়, একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে যেন চার লাখ ইউরো করে জরিমানা করা হয়।

পুলিশের যে সদস্যরা আমাদের কারাগারে নিয়ে যাছিল, তারা মাঝপথে আমাদের আইসক্রিম খাওয়ালো। তারা আমাদের কাছে বারবার দুঃখ প্রকাশ করছিল। বলছিল, তাদের কিছুই করার নেই।

About dhakacrimenews

Check Also

বনানী প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে করোনা নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা অব্যাহত

বেলায়েত হোসেনঃ তৃতীয় দিনের মতো আজও (২৮ মার্চ) বনানী প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *