Breaking News
Home / ইসলাম / বিশ্ব ইজতেমা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা: ডা: মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান

বিশ্ব ইজতেমা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা: ডা: মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান

প্রতি বছর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম জমায়েত হয় সৌদি অারবের মক্কা নগরীতে অার দ্বিতীয় বৃহৎ জমায়েত হয় বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার সন্নিকটে টঙ্গী নামক স্থানে। টঙ্গী ঢাকার অতি নিকটে হলেও তা বর্তমানে গাজীপুর জেলার অধিন অার এ জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসনকে এই বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনার জন্য সকল প্রকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এটা অনস্বীকার্য যে গাজীপুর জেলা প্রশাসনকে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের সাথে সমন্বয় সাধন করে এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয়। অার এ জন্য গাজীপুর জেলার সকল বিভাগসহ জেলা প্রশাসন দেশী-বিদেশী মুসলিম ওম্মাহর সকল মহল থেকে ধন্যবাদ পাবার দাবিদার।

২০১৯ সালের নির্ধারিত বিশ্ব ইজতেমা জানুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত হতে পারে নাই ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা যে নেতার দিক নির্দেশনায় চলেন সেই নেতা বা নেতৃবৃন্দের মধ্যে মত বিরোধের কারণে। এই মত বিরোধের সূত্রপাত হয় গতবারের বিশ্ব ইজতেমা শুরুর পূর্ব থেকেই মূলত: ভারতীয় মাওলানার বিতর্কিত ফতোয়াকে কেন্দ্র করে যা বিশ্ব ইজতেমা চলার সময় অারও প্রকট অাকার ধারন করে। বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনাকারী ভারতীয় দিল্লী মারকাজের বিশ্ব বরেন্য অামীর মাওলানা সা’দ কে কাকরাইল মসজিদের খতিব মাওলানা মো: জোবায়ের সাহেবের অনুসারীদের পক্ষ থেকে ইজতেমায় অংশ নিতে নিষেধ করা হয়। কারণ, তিনি ভারতীয় দেওবন্দের ফতোয়ার পক্ষাবলম্বন করেন। মাওলানা সা’দ সেই নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করে বাংলাদেশে অাসেন। তাঁর অাসার খবরে হযরত শাহজালাল অান্তর্জাতিক বিমান বন্দরের বাইরে জনতার প্রতিবন্ধকতা বলয় তৈরী করে রাখা হয় যাতে তিনি ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে না পারেন। যার দরুন মাওলানা সা’দ বিমান বন্দর অভ্যন্তরেই অন্তরীন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রস্থল মসজিদে স্থানান্তর ও সেখানে রেখে বড় ধরনের সম্ভাব্য হিংস্র ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করা হয়।
গতবারের ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমা মাওলানা সা’দকে বাদ রেখেই পরিচালনা ও সম্পন্ন করা হয় এবং তাঁকে স্বসম্মানে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। তখন থেকেই অামাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি হয়ে পড়ে, যার এক দল মাওলানা সা’দ অনুসারী অার একদল মাওলানা জোবায়ের অনুসারী। এবাবের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতি লগ্নে ২০১৮ সালের শেষের দিকে বিভক্ত দুই দলের মধ্যে ইজতেমা ময়দানে সৃষ্ট গোলযোগের কারণে একজন মুসুল্লী মারা যান। ভবিষ্যতে উদ্ভূত হিংস্র ঘটনা প্রতিরোধের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মুসলিম নেতাদের সাথে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কয়েক দফা বৈঠকের ফলশ্রুতিতে যে সিদ্বান্ত অাসে তা হলো দুই মতাদর্শে বিভক্ত মুসলিমদের জন্য একই সপ্তাহে কিন্তু দুই দফায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৫-১৬ ফেব্রুয়ারী মাওলানা জোবায়ের -এর অনুসারীদের জন্য এবং দ্বিতীয় দফায় ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারী মাওলানা সা’দ -এর অনুসারীদের জন্য। যা একদিন বর্ধিত করা হয় গত রবিবার সকালের অাকস্মিক ও ভারী বৃষ্টির দরুন মুসুল্লীদের অাসা এবং তাবুতে অবস্থানে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণে। অাবারও দুই অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তির জের রয়ে গেল দিন কম বেশি পাবার কারণে। প্রথম দলকে মাত্র ছয় ঘন্টা সময় দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইজতেমা ময়দান খালি করতে বলা হয়েছিল যাতে মাওলানা সা’দ অনুসারীরা ঐদিনই ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে পারে। স্বল্প সময়ে প্রথম দলের অনুসারীদের ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করা এবং গন্তব্যে ফেরৎ যেতে নাকি অনেক কষ্ট করতে হয়েছে অার এ জন্য বলাবলিও করছে তাদের জন্য সরকার পক্ষপাতিত্ব করেছে। সরকারী নিষেধাজ্ঞার কারণে মাওলানা সা’দ তাঁর অনুসারীদের নিয়ে এবার বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনা করার জন্য অাসতে পারেননি কিন্তু তাঁর অনুসারীরা সময় বেশি পাওয়াসহ হুড়াহুড়ি না করে ইজতেমা শেষ করার সুযোগ পেয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারী অাখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে মাওলানা সা’দ অনুসারীদের জন্য নির্ধারিত ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা। যার সন্তুষ্টি অাদায়ের জন্য এই জমায়েত সেই মহান রাব্বুল অাল-অামিনই বলতে পারবেন কোন্ দল বেশি ভাগ্যবান। তবে এরূপ দলাদলি, হানাহানিকর পরিস্থিতি বিরাজ করলে অামরা বিদেশি মেহমানদের ভবিষ্যতের জমায়েতে ধরে রাখতে পারব কি না সেটা একটি সংশয়। অার বিদেশি মেহমানদের ধরে রাখতে না পারলে অামাদের দেশ বিশ্ব ইজতেমার স্থান ধরে রাখতে পারবে কি না সেটা অারেক সংশয়। মক্কা নগরীতে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সকল মুসলিম দেশ থেকে নারী-পূরুষ, অাবাল-বৃদ্ধ-বনিতা একই স্থানে সমবেত হচ্ছে। সেখানে মাযহাবভুক্ত বিভিন্ন গোত্র একত্রিত হলেও অারাফার ময়দানে বয়ানের ক্ষেত্রে সেখানে কোন কোন্দল সৃষ্টি হচ্ছেনা বরং শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে হজ্বব্রত পালন শেষে যে যার দেশে ফেরৎ যাচ্ছে। একেক হজ্ব মৌসুমে সৌদি সরকারের কি বিশাল অায়- রেজিষ্ট্রেশণ, মোয়াল্লেম ফী, হোটেল ভাড়া, বিমান ভাড়া ইত্যাদি মিলিয়ে। উপরন্তু কেনা কাটা করে হাজীগণ কত টাকা পয়সা যে সে দেশে ফেলে যাচ্ছে! অামাদের দেশের কত লোক সেখানে দোকান সাজিয়ে হাজীদের নিকট সারা বছর ধরে ব্যবসা করছে। বিশ্ব ইজতেমায় সুন্দর, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে বিদেশি মেহমানদের অাকৃষ্ট করে অামরাও কি পারিনা অামাদের দেশের জন্য সেই রকম সুযোগ সৃষ্টি করতে?

ফেরেস্তাদের সৃষ্টি করার পরও অাল্লাহর তা’য়ালার মনুষ্য সৃষ্টির বাসনা গেলনা। যে সৃষ্টির বিতর্কে ফেরেস্তাদের অন্যতম নেতা অাল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে সেজদা না করে শয়তান উপাধি ধারণ করেছেন এবং সেই মানুষের মধ্যে অাল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস, বিবাদ, দলাদলি, বিভাজন সৃষ্টির ক্ষমতা স্বয়ং অাল্লাহ তা’য়ালার কাছ থেকেই ইবলিশ নিয়ে এসেছেন। অামরা তো বিভক্ত হবই। প্রথম বিভক্তির সূচনা জাতি বা গোত্রে, তারপরে দেশে-দেশে, গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়, পরিবারে, রাজনীতিতে। তারপর ধর্ম-বর্ণেও। কোথায় নেই এই বিভাজন, দ্বন্দ, কোন্দল? বিভিন্ন ধর্মে মতান্তর রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী নামকরনও হয়েছে। মুসলিম ধর্মেও চার মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। কুরঅান যদি মুসলিম ধর্মের পথ প্রদর্শক হয় তবে সেই কুরঅানের অাদর্শ মেনে সকল দেশের সকল মুসলিম কেন এক থাকতে পারিনা? সকল দেশের মুসলিমরা এক না থাকতে পারলে কেনই বা অন্তত: এক দেশেরগুলো এক অাদর্শে চলতে পারিনা? নিজে নিজে যে উত্তর পেয়ে যাই তা হলো কুরঅানের প্রতিটি অায়াতের ব্যাখ্যা অামরা ওলামায়ে কেরামগণ এক রকমভাবে দিতে পারিনা। একেক জনের জ্ঞানের পরিধি একেক রকম, এক জনের বুঝ বা বোধ শক্তি একেক রকম। তাই কুরঅানের একই অায়াতের অর্থ এবং ব্যাখ্যা সেই দেশিয় ভাষায় বা ব্যক্তির ব্যাখ্যায় ভিন্ন হয়ে যায়। অার তা ছাড়া কুরঅানে নির্দেশিত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বাইরে দেশীয়, সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ের উপর ওলামায়ে কেরামগণ নিজ জ্ঞানের অালোকে ফতোয়া দিয়ে থাকেন যেখানে বিবদমান বিষয়ের চুড়ান্ত এবং সন্তোষজনক ফয়সালা না হবার কারণে ভু্ক্তভোগীর মধ্যে দ্বিধা বা সংশয় থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে দ্বিধাগ্রস্থ মন নিয়ে সেই বিশেষ ব্যক্তি, দল বা জাতি নিজস্ব ভাবনার উপরই অাত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলে। থেকে যায় কোন্দলের শেকড় যা অাবারও উজ্জীবিত হয়ে উঠে সুকৌশলী ইবলিশের প্ররোচনায়। তবে এ জামানায় সব কিছুর ঊর্ধ্বে ক্ষমতা অার বৈধ বা অবৈধ অর্থের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে কোন দল, কোন নেতা তৈরী হবার সম্ভাবনা খুবই নগন্য বলে অামার বিশ্বাস। ক্ষমতা অার অর্থের মোহ না থাকলে সেই বিষয়ে ইবলিশ অামাদের প্ররোচিত করেও ফায়দা হাসিল করতে পারবেনা। ইবলিশ তখন অন্য ব্যক্তি, জাতি বা গোত্রের নিকট চলে যায়।

ইজতেমা ময়দানের কোন্ দল সঠিক সে জ্ঞান অামার নাই। অামার মত হাজার হাজার লোক কোন্ মতাদর্শ সঠিক তা না জেনে কিছু স্থানীয় মাওলানার ব্যাখ্যার উপর বিশ্বাস স্থাপণ করে দুই দলে বিভক্ত হয়ে তার পিছু হেঁটে চলছি। অামি কোন দলের পক্ষেই ইজতেমায় উপস্থিত বা মোনাজাতে অংশ নিতে পারিনি। তবে অাল্লাহ সুবহানু তা’য়ালার কাছে অামি অধম বান্দার এই ফরিয়াদ- বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখুন, অামাদের মধ্যে সৃষ্ট গোলযোগের অবসান ঘটিয়ে দিন, অামাদের ঈমান অতি দূর্বল সেটাকে মজবুত করে দিন, অামাদের ভুল বুঝার জ্ঞান দান করে ভুল সংশোধন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিন। সব ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পূর্বের ন্যায় অামাদের এক দলে অন্তর্ভুক্ত করে দিন। সর্বোপরি ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যারা নি:স্বার্থবান, নিবেদিত প্রাণ তাদেরকেই নেতৃত্বের অাসনে অাসীন করে দিন। যারা ক্ষমতা অার অর্থের মোহে অামাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করার অভিসন্ধি করছে তাদেরকে হেদায়েত দান করুন। ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে বিশ্বের মুসলিম ভ্রাতৃত্ব অারও সুদৃঢ় করার সুব্যবস্থা করে দিন। অামীন, ছুম্মা অামীন।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সুলেখক ও সমসাময়িক বিশ্লেষক।

About dhaka crimenews

Check Also

প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইজতেমা মাঠ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন, নির্বাচন পর্যন্ত আগামী এক মাস ইজতেমার সব ধরনের প্রস্তুতি বন্ধ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *