Home / বিনোদন / ডা: মুহাম্মদ মুজিবুর রহমানের মুরগী চোর

ডা: মুহাম্মদ মুজিবুর রহমানের মুরগী চোর

মোল্লা সোহেল-

ঢাকা ক্রাইম নিউজ: মুরগী চোর অতি প্রচলিত শব্দ হলেও সচরাচর কেউ মুরগী চুরি করেনা। কারণ, ডিম পাড়া মুরগী না হলে সেটা স্বাদের হয়না। আবার ডিম পাড়া শেষ হতে না হতেই মুরগী কুইচা হয়ে যায়। কুইচা মুরগীর মাংস সাধারণত: গন্ধ করে আর এ জন্যই মানুষ কুইচা মুরগীর মাংস খেতে পছন্দ করেনা।

তা ছাড়া রাতের আঁধারে মুরগী চুরি করতে গিয়ে বাতি ধরলে মোরগগুলো ঘাড় উঁচিয়ে কক্ কক্ করে উঠে বলে ওদেরকে ধরতে খুব সহজ আর মুরগীগুলো “ক্যাঁ-অ্যা- কুচ-কুচ” আওয়াজ করে দুই পাখা উঁচু করে মাথা গলার নীচে ঢুকিয়ে দেয়। ধরতে গেলে ঠোকরও মারে। তাই, সব কিছু বিবেচনায় এনে মুরগী চোর নাম হলেও সব সময় চোরেরা মুরগীর বদলে কিন্তু মোরগই চুরি করে থাকে।

আবার বাসা-বাড়ী, হোটেল-রেস্তোরায় সব জায়গাতে কিন্তু মোরগের মাংস বলা হয় না। ডিমের ক্ষেত্রে তো বটেই, মাংসের বেলায়ও সর্ব ক্ষেত্রে মুরগীর নামই বলা হয়। আর সে জন্য এ গল্পের মূল বিষয় মোরগ নিয়ে সূত্রপাত হলেও অতি প্রচলিত শব্দ মুরগীই ব্যবহার করা হয়েছে।

ক্লাস এইটে পড়া কালীন বৃত্তি পরীক্ষার্থী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে বোর্ডিং – এ থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি ক্লাস এইট থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিব। সবাই বোর্ডিং-এ থেকে পড়ছে আর আমি বাড়ীতেই বাবা মায়ের কাছে থেকে পড়ি। যারা বোর্ডিং এ থেকে পড়বেনা তাদেরকে নাকি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ দিতে দেয়া হবেনা এটাই প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ। কোন দিন নিজের বাড়ীর বাইরে এবং বাবা- মাকে ছাড়া রাত কাটাইনি। আমার মন সায় দিচ্ছে না। মাকেও বলতে শুনলাম বৃত্তি পরীক্ষা দেবার দরকার নাই।

কিন্তু পরীক্ষা যে আমাকে দিতেই হবে। মনের কষ্ট চাপা দিয়ে বিছানাপত্র নিয়ে একদিন চলে গেলাম বোর্ডিং-এ রাত কাটাতে আর সহপাঠীদের সাথে পড়া- লেখার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সে সময় এলাকায় বিদ্যুতের কথা কল্প-কাহীনি ছিল বিধায় হারিকেনের আলোতে রাত দশটা পর্যন্ত পড়া লেখা করলাম।

গ্রামের স্কুলে বোর্ডিং, রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার রুমের তিন জনই শুয়ে পড়লাম। বাবা- মা দু’জনের কথাই মনে পড়ছে। বেশি মনে পড়ছে মায়ের কথা কারণ, আমার পড়া শেষ না হলে মা কোনদিন ঘুমাতে যেতেননা। আর এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।

হঠাৎ মুরগীর কক্ কক্ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। রুমে বাতি নাই কিন্তু বুঝতে পারলাম বিছানার কাছেই মুরগী পাখা চাপড়াচ্ছে এবং শেষবারের মত ক-অক্ আওয়াজ করে থেমে গেল। বিছানায় উঠে বসলাম। কিছুক্ষণ পরেই এক সিনিয়ার ভাই বটি এবং হারিকেন নিয়ে প্রবেশ করল। হারিকেনের বাতিতে দেখলাম সদ্য জবাই করা দু’টা মোরগ, বেশ বড় সাইজের। এর একটি লাল-কালোতে মিশানো রঙের আরেকটি টকটকে লাল।

– এত রাতে মুরগী জবাই করলা ক্যান্? – আমার প্রশ্ন।

– রাতের কেনা মুরগী রাতেই তো জবাই করতে হয়।

– রাতের কেনা মানে? এত রাতে কোথাও মুরগী কিনতে পাওয়া যায় নাকি?

– চুপ করে শুয়ে থাক্, বাইরে থেকে শোনা যাবে!

ধমকে চুপ মেরে গেলাম আর বুঝতে পারলাম ঘটনা স্বাভাবিক নয়।

আবার শুয়ে পড়লাম। মুরগী বানানো প্রায় শেষ এমন সময় পা মেরে চুপি চুপি আসা কয়েক জন লোকের কথার শব্দে আবার উঠে বসলাম। যা শুনলাম তা এমনটি- খোয়াড় থেকে যখন মোরগ ধরা হয়, বাড়ীর কর্তা মনে করেছিলেন হয়তো শিয়ালে খোয়াড় থেকে মুরগী নিচ্ছে আর এ জন্য ধর ধর শব্দ করে বিছানা ছেড়ে উঠতেই শুনতে পান মানুষের পায়ের ধপ ধপ শব্দ। ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পান একটি টর্চের আলো পিছন দিকে ধরে মানুষ মাঠের মধ্য দিয়ে দৌঁড়ে পালাচ্ছে। সেই বাতি অনুসরন করে উনারা কয়েকজন মিলে বাতি নিভে যাওয়া স্থান, স্কুল মাঠ পর্যন্ত এসেছেন। আমার রুমে আলোর উপস্থিতিতে উনারা উঁকি দিয়ে যা দেখলেন তাতে একদম হাতে-নাতে ধরা!

পরে আরও যা জানলাম তা হাসির উদ্রেক করেছিল বটে তবে লাজ-শরম আর ভয়ে মুখ চেপে রইলাম।

বোর্ডিং এ মাংস দিয়ে মজা করে ভাত খাবার ইচ্ছায় দুই সিনিয়ার ভাই গিয়েছিল স্কুলের কাছাকাছি এক বাড়ীতে মুরগী চুরি করতে। মুরগী চোরের দুই জনের মধ্যে এক জনের হাতে ছিল টর্চ লাইট, সেই প্রথমে খোয়াড় থেকে একটা মোরগ ধরে দ্বিতীয় জনের হাতে দেয়। দ্বিতীয় মোরগ ধরার সময় একটু কঠিণ হচ্ছিল আর খোয়াড়ের সব মুরগী একসাথে কক্ কক্ আওয়াজ করে উঠে। মোরগ ধরার পর যখন বাড়ীর কর্তা ধর ধর বলে চিৎকার করেছে তখন জ্বলন্ত টর্চ লাইটটা বগলে চেপে রেখে এক হাতে মোরগের পাখা এবং আরেক হাতে মোরগের গলা চেপে ধরে দিয়েছে দৌঁড়। সাথে থাকা আরেক জন প্রথমে বের করা মোরগটা একই কায়দায় ধরে দ্বিতীয়টার জন্য অপেক্ষা করতেছিল। বাড়ীর কর্তার শব্দ শোনার সাথে সাথেই ওর সাথী চোরকে ফেলে আগে আগেই দৌঁড়ে পালিয়েছে বিধায় টর্চের আলো তারও চোখে পড়ে নাই।

মুরগীর মালিক এবং সাথে আসা লোকেরা রাতে আর কোন শোরগোল না করে চলে গেলেন।

মুরগী চোরদ্বয় সে সময়টায় কোন কথা বাড়ায়নি কিন্তু তাদের চলে যাবার পর খুব ভাব দেখানো শুরু করল। বোর্ডিং এ উপস্থিত সকল ছাত্রের মুখ লজ্জায় ম্লান হয়ে গেলেও ওদের মুখে লাজ-সরমের কোন ছায়াও দেখা গেলনা। ওদের ভাবে মনে হলো এসব ঘটনা খুবই তুচ্ছ এবং এ বয়সী ছেলেদের জন্য এটা খুবই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। রাতে সবাই যার যার মত ঘুমিয়ে পরলাম।

পরদিন সকালে নাস্তা করার সময় দেখলাম ভাতের সাথে আলু ভর্তা আর ডাল। এর ওর কাছ থেকে শোনলাম, চুরি করা মুরগীর মাংস নাকি দুপুরে রান্না করা হবে এবং সাথে পোলাও!

একটা ক্লাস শেষ হতেই দপ্তরী এসে খবর দিয়ে গেল প্রধান শিক্ষকের রুমে যেতে। আত্মাটা ছ্যাৎ করে উঠল! গিয়ে দেখি মুরগী চোরদ্বয় মাথা নিচু করে প্রধান শিক্ষকের সামনে দন্ডায়মান এবং চেয়ারে বসা সবচেয়ে রাগী দুই শিক্ষক এবং রাতে মুরগী চোর ধরতে আসা লোকেরা।

প্রধান শিক্ষকের প্রশ্নে বুঝতে পারলাম আমাকে ঘটনার স্বাক্ষী হিসাবে সেখানে ডাকা হয়েছে যেহেতু রাতে মুরগী আমার রুমেই জবাই করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। আমি ওদেরকে রক্ষা করার সাহস পেলামনা। কারণ, ওই রাগী দুই শিক্ষক বেতিয়ে প্রস্রাব করিয়ে ছাড়বে অতীতে এমন বিচার-আচার ঘটতেও দেখেছি। তাই, কি অবস্থায় কি দেখেছি সবই অকপটে খুলে বললাম।

রাজ স্বাক্ষীর পর শিক্ষকগণ আর কোন কথাই কাউকে জিজ্ঞেস করলেননা। বিচারের রায় এবং বিচার কাজ দু’টাই একসাথে শুরু হয়ে গেল। প্রমাণাদি সাপেক্ষে যে বিচার হলো তা –

১. দুই মোরগের দাম সাব্যস্ত করে মালিককে ফেরত দেয়া হলো।

২. দুই রাগী শিক্ষক একই সাথে দুই চোরের প্রত্যেককে জনসমক্ষে বাঁশের কাঁচা কঞ্চি দিয়ে বেত্রাঘাত শুরু করলেন। আমি দাঁড়িয়ে থেকে দশ-বারটার মত গুনেছিলাম এর মধ্যে মুরগীর মালিকের পক্ষ থেকে দুইজন দুই শিক্ষকের বেত ধরে ফেললেন।

৩. সব শেষে, বোর্ডিং পরিচালনার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকার কারনে প্রধান শিক্ষক স্কুলের বোর্ডিং বন্ধ করে দেবার ঘোষণা দিলেন।

“মুরগী যাক, চোর তো চিনেছি” এই প্রবাদের প্রতিফলন দেখে ও শিক্ষকদের বিচারে হয়তো সন্তুষ্ট হয়ে মুরগীর মালিক পক্ষ চুরি করা মুররগীর দাম প্রধান শিক্ষকের হাতে গুঁজে দিয়ে বিদায় নিলেন।

বাবা- মাকে ছাড়া একটি রাত আমার বোর্ডিং- এ কাটানো যেন ছয় মাস কারা বাসের মত মনে হচ্ছিল। মনে মনে আল্লাহকে ডেকেছিলাম। প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্তের কারণে বোর্ডিং- এ না থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেল । স্কুলের ক্লাস শেষে যে যার মত মনের সুখে বিছানা-পত্র নিয়ে বাড়ী চলে গেলাম।

লেখক-

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ,

বিশ্লেষক ও রম্য লেখক

About dhaka crimenews

Check Also

নিরাপত্তার জন্য পরিচয় গোপন!

আমির খান ও ইরা ২০০২ সালের ডিসেম্বরে রীনা দত্তের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি টানেন আমির ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *