Breaking News
Home / রাজনীতি / বিএনপি নিয়ে যা বলেছিলেন জিয়া

বিএনপি নিয়ে যা বলেছিলেন জিয়া

ঢাকা ক্রাইম নিউজঃ পয়লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চল্লিশে পা দিয়েছে। উনচল্লিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি। এ উপলক্ষে অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি এবার বিএনপি দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ প্রাথমিক সদস্যপদ নবায়ন করছে। দুই মাসব্যাপী এ কর্মসূচি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা।

নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সাড়াও মিলেছে বেশ। শাসক দলের হামলা ও প্রশাসনের বাধা এবং বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত সমস্যায় ঘোষিত লক্ষ্য হয়তো পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না।

সেটা তেমন উদ্বেগের বিষয় নয়। এ সদস্য সংগ্রহ ও নবায়নের পরিসংখ্যানগত দিকই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। দেশের বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলের সামনে আগামী দিনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবেলায় যে বাস্তবানুগ কর্মকৌশল গ্রহণ করা জরুরি তা কতটা হচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য।

 

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। জাতিকে কোথায় নিতে চান সে সম্পর্কে তার মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। জিয়াউর রহমান তার লেখা ‘আমার রাজনীতির লক্ষ্য’ নিবন্ধে তার দলে সদ্য যোগ দেয়া সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন ‘এখন আরো শক্ত রাজনীতি করতে হবে।

এ ধারায় যারা টিকতে পারবে না, তারা থাকতে পারবে না’। তিনি বলেন, ‘শুধু জাতীয়তাবাদে বিশ^াস করে বসে থাকলে চলবে না। এর সদস্য বা সদস্যা হওয়াটাই সব কিছু নয়। জাতীয়তাবাদের অনুশীলন করতে হবে, প্রাকটিস করতে হবে। তবেই আপনারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অনুসারী হতে পারবেন’।

 

দূরদর্শী ও বিচক্ষণ জিয়াউর রহমান তখনই বুঝেছিলেন, কেবল বিপুল সমর্থক দিয়েই কোনো রাজনীতি সফল হয় না। দলের কোটি কোটি সদস্য থাকলেই প্রতিপক্ষের কূটচাল ও অপরাজনীতি মোকাবেলা করে বিজয় অর্জন করা যায় না। রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ^াস নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই সাফল্য ধরা দেয় না।

বরং সেই আদর্শের রাজনীতিটা করতে হবে শক্তভাবে। অনুশীলন করতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ে। বেশ কিছু দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। অনেকে বলতে চাইছেন যে, বিএনপি পথ হারিয়েছে; কারো কারো বিশ্লেষণে বিএনপির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বা অন্ধকার।

বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এলোমেলো বলেও অনেকের কলমে ও বক্তব্যে উঠে আসছে। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত- এমন অনেক বিশ্লেষকও বিভিন্ন সময়ে বর্তমান বিএনপির বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলছেন।

আবার কেউ কেউ প্রতিপক্ষ ঘরানার হয়েও বন্ধুবেশে দরদি নসিহত দিচ্ছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা, দল পরিচালনার কলাকৌশল, জোট রাজনীতির সুফল-কুফল এমনকি কাকে সাথে রাখা উচিত, আর কাকে পরিত্যাগ করতে হবে সে জ্ঞানও দিচ্ছেন বিরামহীনভাবে।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট তো বিএনপির পিণ্ডি না চটকালে কলমে জোশ পান না। আসলে বিএনপির ভাগ্যটা এমনই। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা ১৯৭৫ সালের ১৬ জুনে কলমের এক খোঁচায় খুন হওয়া শত শত সংবাদপত্রকে পুনর্জীবন দিয়েছিলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্র প্রকাশনাকে অবারিত করেছেন, যে দলের চেয়ারপারসন এখনকার শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব সংবাদপত্রের ডিকারেশন ও বহু বেসরকারি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেয়াসহ গণমাধ্যমের বিকাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, সে দল সমসময়ই মিডিয়ার বিরাগভাজন।

কী ক্ষমতায়, কী বিরোধী দলে সব সময়ই সংবাদপত্রের নেতিবাচক শিরোনাম হয় বিএনপি।
স্বাধীনতা-উত্তর সরকার সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে এক দলীয় বাকশাল কায়েম, রক্ষীবাহিনী ও লালবাহিনী গঠন এবং ভিন্নমত প্রকাশের সব পথ রুদ্ধ করে দেয়ার পর এ দেশে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেÑ তখন তা কেউ ভাবেনি।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি, ৩ নভেম্বরের প্রতিবিপ্লবের পর বস্তুত ৭ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সূচনা।

সেদিন সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান সিপাহি জনতার সমর্থনে ক্ষমতাকেন্দ্রে আবির্ভূত হন। পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন, তখন অবস্থা ছিল ভয়াবহ। ওই কঠিন সময়ে বীর উত্তম জিয়াউর রহমান তার দৃঢ় ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা করে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন হয়ে পড়ে একটি শক্তিশালী দেশপ্রেমিক প্ল্যাটফর্ম। রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে জিয়া তার শাসনকে দ্রুত অসামরিকীকরণের লক্ষ্যে একের পর এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেন।

মেজর জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তারই পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই বছর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয় ফ্রন্টের প্রার্থী জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে হারিয়ে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন।

নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার অব্যাবহিত পরেই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রেসিডেন্ট জিয়া বিএনপি গঠনের সময় যে বিষয়গুলো সামনে রেখেছিলেন সেগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত ও সংহত ইস্পাত কঠিন গণঐক্য, জনগণভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত অকান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে লব্ধ জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি।

এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের সোনালি ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আমাদের পবিত্র আমানত এবং সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় ও সংরক্ষিত করে রাখাই হচ্ছে আমাদের সবার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

বিবর্তনশীল ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত গণপ্রচেষ্টা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কালজয়ী রক্ষাকবচ।

বিএনপি পথ হারিয়েছে না সঠিক পথে আছে, তা মূল্যায়নের জন্য দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন কতটা অনুসৃত হচ্ছে, তা পরখ করে দেখা যেতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঐক্য ও সমন্বয়ের রাজনীতি এখনো বিএনপির রাজনীতির মূল কথা।

শহীদ জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি বিএনপির বর্তমান চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঐক্যের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে এগোনোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে আরো বেগবান করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং করছেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া এখন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কাণ্ডারি ও পুরোধা।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ঐতিহ্যের ধারক এবং জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ প্রদর্শক। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রত্যাখ্যানের সময়ে গোটা দেশবাসীকে এককাতারে দাঁড় করানো খালেদা জিয়ার অবিস্মরণীয় সাফল্য।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট শুধু নয়, দেশের নিবন্ধিত বেশির ভাগ দলকে নির্বাচনটি বর্জনে এক করতে পেরেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া। এ কারণে মাত্র ৫ শতাংশের মতো ভোটার উপস্থিতিতে কলঙ্কিত নির্বাচনী মহড়া সম্পন্ন হয়েছে। এটা শহীদ জিয়ার ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত গণচেষ্টার যে নীতি, তারই সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে টিকে যাওয়া কিংবা ভোট বর্জনের ফসল ঘরে তুলতে না পারা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও দেশের কায়েমি স্বার্থবাদী রাজনীতির আলাদা পাঠ। এটা খালেদা জিয়া বা বিএনপির একক ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রিত করলে অবিচার করা হবে।

 

দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রমনা মানুষের প্রত্যাশা ও আকাক্সার সাথে সঙ্গতি রেখে রাজনীতি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া দৃঢ় প্রত্যয়ী। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চর্চার নীতি থেকে বিএনপিকে বিচ্যুত হতে দেননি তিনি।

চল্লিশ বছরের স্মৃতিবিজড়িত নিজ বাসস্থান হারানো, বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হয়ে এক সন্তানের মৃত্যু, ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে আরেক সন্তানের নির্বাসিত জীবন, কারাবন্দিত্ব, প্রতিহিংসামূলক ডজন ডজন মামলায় নিয়মিত কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, রাস্তায় নামলেই হামলার শিকার হওয়ার মতো জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও আপসের চোরাবালিতে পা দেননি কখনো। শারীরিক অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতাজনিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার, পরমত সহিষ্ণুতা, সততা এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনবিরোধী আপসহীন সংগ্রামী মনোভাব এখনো প্রশ্নাতীত। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা-ভরসার কেন্দ্রেই তার অবস্থান।

তবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত ও সংহত ইস্পাত কঠিন ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিএনপির কোনো কোনো নেতা এবং এক শ্রেণীর কর্মীর মধ্যে বেশখানিকটা ঘাটতি যে দেখা দেয়নি, তা হলফ করে বলার সুযোগ কম।

ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত কর্মীবাহিনীর অকান্ত প্রয়াসের অভাবও লক্ষণীয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের পূর্বাপর এবং ২০১৫ সালের টানা আন্দোলনকালে কিংবা ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’র কর্মসূচির ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর দায়িত্বশীল নেতার আপসকামী ও আত্মঘাতী ভূমিকা দলটিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শহীদ জিয়ার অপরিসীম দেশপ্রেম, দুরন্ত সাহস, নিরেট সততা ও কর্মনিষ্ঠার যে শিক্ষা, তা ধারণ ও লালনের অভাব।

সর্বোপরি, প্রাজ্ঞ, বিদগ্ধ রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে টেনে নিয়মিত তাদের পরামর্শ গ্রহণ এবং সে অনুযায়ী সময়োপযোগী দৃঢ় পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও কিছুটা ঘাটতি যে ছিল না বা নেই, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। আগামী দিনে দলটি এ বিষয়ে আরো সজাগ ও সতর্ক হবে এটাই কাম্য।
লেখক : সাংবাদিক ও মহাসচিব, বিএফইউজে

About Dhakacrimenews24

Check Also

বাংলাদেশ’ মিয়ানমারের উসকানিতে সাড়া দেবে না : সেতুমন্ত্রী

জহির রায়হান- ঢাকা ক্রাইম নিউজঃ  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আকাশসীমা ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *